বাংলা আভাঁগার্দ আন্দোলনের নায়ক ত্রিদিব মিত্র : সুবিমল বসাক

 হাংরি আন্দোলনের দ্রোহপুরুষ ত্রিদিব মিত্র এবং তাঁর তদানীন্তন প্রেমিকা আলো মিত্র ( যাঁকে তিনি পরবর্তীকালে বহু ঝড়-জলের পর বিয়ে করেন ) সম্পর্কে পত্র-পত্রিকায় বিশেষ লেখালিখি দেখতে পাওয়া যায় না, তার কারণ আন্দোলনকারীদের কয়েকজন আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন, ষাটের সেই টালমাটাল সময়ে, যাতে এই প্রেমিক-প্রেমিকা জুটি বিশেষ বিজ্ঞাপিত ও প্রচারিত না হন। হাংরি জেনারেশন কেবল একটি পত্রিকা হয়ে থেকে যেত ত্রিদিব ও আলোর অবদান ছাড়া। তা যে আন্দোলন হতে পেরেছে তার কারণ এঁদের দুজনার অভাবনীয় তৎপরতা।কালীদা, যিনি খালাসিটোলা ভাটিখানার মালিক বা ম্যানেজার ছিলেন, বলেছিলেন যে আলো মিত্রের আগে আর কোনো মহিলা খালাসিটোলায় ঢোকার সাহস করেননি।

ষাটের দশকে যা নতুন-নতুন কার্যকলাপ সাহিত্যিকরা আরম্ভ করেছিলেন তা ত্রিদিব মিত্র ও আলো মিত্রর মস্তিষ্কপ্রসূত। তাঁরাই প্রথম পোস্টকার্ডে কবিতা, পুস্তিকার আকারে কবিতা, রঙিনকাগজে কবিতা, ভাঁজকরা কাগজে কবিতা আরম্ভ করেছিলেন।তাঁরাই প্রথম মাইকেল মধুসূদন দত্তের  সমাধিতে কবিতা পাঠের আয়োজন করেছিলেন। তাঁরাই প্রথম খালাসিটোলা নামে কলকাতার বিখ্যাত ভাটিখানায়, জীবনানন্দ দাশের  জন্মদিনে, পত্রিকার প্রথম সংখ্যা প্রকাশের অনুষ্ঠান করেছিলেন।খালাসিটোলায় কবিতা পাঠের অনুষ্ঠানও তঁদের অবদান। তাঁরা দুজনে দুটি পত্রিকা প্রকাশ করতেন; ইংরেজিতে 'ওয়েস্ট পেপার' ও বাংলায় 'উন্মার্গ' । তাঁদের পূর্বে বাংলা সাহিত্যে পত্রিকার এরকম নাম রাখার কথা কেউ চিন্তা করতে পারতেন না। বস্তুত, তার পর থেকে পত্রিকার নামকরণে বিপ্লব ঘটে গিয়েছে পশ্চিমবাংলায়।

মলয় রায়চৌধুরী  ও  দেবী রায়   যে-সমস্ত মুখোশ হাংরি আন্দোলনের পক্ষ থেকে বিলি করার জন্য ছাপিয়েছিলেন, জোকার দানব পশু পাখি মিকিমাউস দেবী-দেবতা ইত্যাদি, সেগুলি এনারা দুজনে পৌঁছে দিয়ে আসতেন তখনকার মন্ত্রী ও প্রশাসনের কর্ণধারদের, সংবাদপত্র-মালিকদের , যার জন্য যথেষ্ট বুকের পাটা দরকার। এনারা দুজনে কাঁধে মই নিয়ে কলকাতা ও হাও্ড়ার কলেজ ও অন্যত্র হাংরি আন্দোলনের পোস্টার সাঁটতেন; পোস্টার এঁকে দিতেন অনিল করঞ্জাই  ও করুণানিধান মুখোপাধ্যায়  ।হাংরি আন্দোলনের পূর্বে কবিতার পোস্টারের ধারণা কলকাতার সাহিত্যিকদের ছিল না।

ত্রিদিব মিত্রের জন্ম হাওড়ার অভিজাত পরিবারে, ১৯৪০ সালের ৩১ ডিসেম্বর। তিনি স্কুল-ফাইনাল পরীক্ষার পর অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের উদ্দেশ্য বাড়ি থেকে পালান , এবং চল্লিশ দিনের যে হোলি উৎসব মথুরা ওবৃন্দাবনে হয়, তাতে অংশ নিয়েছিলেন। যাঁরা ওই উৎসবে কখনও অংশ নিয়েছেন তাঁরাই কেবল জানেন ব্যাপারটা কত আনন্দদায়ক ও উৎশৃঙ্খল। তিনি ছিলেন ফর্সা ও সুপুরুষ, এবং স্বাভাবিকভাবেই তাঁর অভিজ্ঞতা ভালো হয়নি। এই অভিজ্ঞতা তাঁকে ক্রুদ্ধ ও সমাজ সম্পর্কে বিতৃষ্ণ করে তুলেছিল, যা লাঘব হয় হাংরি আন্দোলনে যোগ দেয়ার মাধ্যমে।

ত্রিদিবের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল খালাসিটোলার ভাটিখানায়।তারপর আমার মাধ্যমে মলয়ের সঙ্গে ও অন্যান্যদের সঙ্গে। মলয়ের সঙ্গে নৈকট্য গড়ে ওঠে ত্রিদিবের এবং সেকারণেই ত্রিদিবের পত্রিকা দুটি হাংরি আন্দোলনের অভুমুখ হয়ে ওঠে।ওর পত্রিকা প্রকাশিত হলেই আমরা দল বেঁধে খালাসিটোলায় অনুষ্ঠান করতাম; তারপর বাইরে বেরিয়ে কলকাতার পথে অনেক রাত পর্যন্ত চরে বেড়ানো; কখনও বা গাঁজার পুরিয়া ম্যানেজ করে রামকৃষ্ণ ঘাটে সারা রাত। পকেটে টাকা থাকলে বেপাড়ায়। ত্রিদিবের সুপুরুষ চেহারার জন্য ওর খাতির হত বেশি, গালও টিপে দিত কেউ-কেউ।

পেটে মদ পড়লেই ত্রিদিবের কন্ঠ থেকে কথা ছুটতে শুরু করত; অন্য সময় ও একেবারে চুপচাপ, কারোর সঙ্গে তখন কোনো কথা বলত না।একেবারে ফালগুনী রায়ের বিপরীত চরিত্র।আমরা কফিহাউসে একত্রিত হলেও অত্যধিক কথাবার্তায় বিরক্ত ত্রিদিব সাধারণত কফিহাউসে যেত না। যেত তখনই যখন হাংরির কোনো বুলেটিন বা মুখোশ বা পোস্টকার্ড বা ফোল্ডার বিলি করার থাকত, কিংবা কফিহাউসের সিঁড়ির দেয়ালে পোস্টার লাগাবার থাকতো। অনেকে পোস্টার ছিঁড়ে দিতো বলে ত্রিদিবের সঙ্গে তাদের হাতাহাতি রুখতে হতো আমাদের।

ত্রিদিব ও তার প্রেমিকার হাংরি তৎপরতার কারণে হাংরি আন্দোলনের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়লেও, ত্রিদিব নিজের লেখালিখিকে অবহেলা করেছে, যখন কিনা অন্যান্য হাংরি আন্দোলনকারীরা সে-সময় নিজেদের লেখায় মনোনিবেশ করেছেন।

কেবলমাত্র দুটি কবিতা-পুস্তিকা রেখে গেছেন ত্রিদিব -- ঘুলঘুলিপ্রলাপ-দুঃখ ঘুলঘুলি  ছিল ফোল্ডারের আকারে এবং প্রলাপ-দুঃখ  ছিল ৪৮ পৃষ্ঠার, ল্যাকভার্নিশহিন কালো রঙের মলাট, কাভারে ত্রিদিবের কোমর পর্যন্ত নেগেটিভ ছবি -- শুয়ে আছে ঘাসের ওপর, হাতে সিগারেট। গণেশ পাইন  এঁকে দিয়েছিলেন ওর প্রলাপ-দুঃখ  বইটির প্রচ্ছদ। বইটি প্রকাশের পরও ত্রিদিব সেইভাবে প্রচার করেনি, যখন কিনা হাংরি বুলেটিন সে পৌঁছে দিত সকলের টেবিলে বা বাসায় বা দপতরে।

ফালগুনী রায়ের মতই একলা থাকতে ভালো বাসত ত্রিদিব মিত্র।নিস্পৃহ ছিল নিজেরই লেখালিখির প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে।তার কিংবদন্তি গড়ে ওঠে মূলত আলোর সঙ্গে ওই ষাটের দশকে লিভ-ইন, তা সত্তেও অবাধ যৌনতা, বেশ্যাদের মধ্যে বিস্ময়কর পপুলারিটি, কাঁচা মাছ ও কাঁচা মাংস খাবার জন্যে একগুঁয়ে লোভ, ঘনঘন সিগারেট খাওয়া (অধিকাংশ সময়ে গাঁজা বা চরস দিয়ে), টিপিকাল হাওড়ার কথ্যভাষায় কথা বলার ঝোঁক, জীবনানন্দের কবিতা আওড়াতে থাকা, খালি গায়ে রাস্তায় হাঁটা।

ব্যাংকশাল কোর্টে যখন মলয় রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে কেস চলছিল তখন শৈলেশ্বর ঘোষ, সুভাষ ঘোষ, সুবো আচার্য, বাসুদেব দাশগুপ্ত, প্রদীপ চৌধুরী, রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় কারোর টিকিটি দেখা যেত না ।শৈলেশ্বর আর সুভাষ তো রাজসাক্ষী হয়ে গিয়েছিল, এবং সে-বাবদ টাকাও পেয়েছিল সরকারের কাছ থেকে। আমি যেতাম আর যেত ত্রিদিব ও আলো; অনেক সময়ে ফালগুনী রায়।

এতদিন ধরে আমরা গাদাগাদা বই পেয়েছি: ফুলের বই, পাখির বই, সেলাইয়ের বই, রান্নার বই, ছবি লেখার বই, ঘরকন্নার বই, ডেবিটক্রেডিটের বই, পোস্টাপিসের বই, সমাজতত্বের বই, শাক-সব্জি ফলানোর বই, গানের বই, প্রাপ্তবয়স্কের বই -- এই নানা ধরণের বই; তেমনি এতদিন ধরে পেয়ে এসেছি যন্ত্রণার কবি, হতাশার কবি, প্রেমের কবি, মুক্তি-যুদ্ধের কবি, নিসগৈর কবি, জনপদ কবি, রোমান্টিক কবি, মৌমাছির কবি -- এমন ধারা অনেক। জীবনের কবি । সারপ্রাইজিং ব্যাপার। ত্রিদিবের লেখালিখি জীবনের সঙ্গে অমন ওতপ্রোত ভাবে জড়িত বলেই তার রচনা অমোঘ, দোষময় ও কলঙ্কিত।মনে পড়ে, বিষ্ণুপুর শহর থেকে তিন মাইল দূরে ব্রীড়াবতী নদীতে আমি, মলয়, সুবো আর ত্রিদিব বেশ কয়েক ঘন্টা সম্পূর্ণ উলঙ্গ হয়ে স্নান করেছিলাম; বহু চাষি সেসব দেখে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাননি। তার পরেও, চাষিদের দৌলতে, বালির চড়ায় মহুয়া টেনে পড়েছিলাম আমরা।

প্রলাপ-দুঃখ  কাব্যগ্রন্হে ত্রিদিব দেখিয়েছে মুদ্রার অপরপিঠ।একথা আজ আর বলার অপেক্ষা রাখে না যে সাহিত্যের কমিটমেন্ট ও রাজনীতির কমিটমেন্ট এক নয় । রাজনীতির কমিটমেন্ট বিধানসভার-লোকসভার বাইরে ভেতরে আলাদা হতে পারে, কিন্তু সাহিত্যে একবার কমিটেড হয়ে গেলে তার আর ফেরার উপায় থাকে না, বিশ্বাসঘাতকতা ছাড়া।

মলয় লেখালিখি দুই দশকের জন্যে ছেড়ে দিয়েছিল, যে কারণেই হোক, জানি না। ত্রিদিবও মলয়ের সঙ্গে লেখালিখি ছেড়ে দিয়েছিল, কিন্তু আর ফেরেনি, এমনকি আমাদের কারোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখেনি।এমনই তার ঘৃণা ও ক্রোধ। সে কাউকে ক্ষমা করেনি। ফালগুনী তবু ক্ষমা করে দিয়েছিল শৈলেশ্বর ও সুভাষকে, ত্রিদিব করেনি। ত্রিদিবের মতে হাংরি জেনারেশন আন্দোলনকে দূষিত করে দিয়েছিল এই দুইজনের কার্যকলাপ।

( রচনা: ৯ মে ১৯৭২ )

 

 



Comments

Popular posts from this blog

The Hungryalists : Book Review

Malay Roychoudhury Interviewed by Zinia Mitra and Jaydeep Sarangi

Interview with Malay Roychopudhury